নীল বিদ্রোহ
১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত নীল বিদ্রোহের পশ্চাতে ছিল একাধিক কারণ। এটি মূলত ছিল কৃষকদের দীর্ঘদিন ধরে পুঞ্জিভূত নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। নীল বিদ্রোহের বিশেষ কিছু কারণ গুলি নিম্নে আলোচিত হলো-
নীল বিদ্রোহের সূচনাস্থল :
নীল বিদ্রোহের প্রথম সূচনা হয় তৎকালীন নদিয়া জেলার চৌগাছা গ্রামে। এই বিদ্রোহ বর্ধমান, বাঁকুড়া, মালদহ, মুরশিদাবাদ, দিনাজপুর, পাবনা, ফরিদপুর, খুলনা প্রভৃতি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
নীল বিদ্রোহের নেতৃবৃন্দ :
নীল বিদ্রোহের প্রধান নেতা ছিলেন বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস, দিগম্বর বিশ্বাস, কাদের মোল্লা, রফিক মণ্ডল, মোরাদ বিশ্বাস প্রমুখ ব্যক্তিরা। *নীল বিদ্রোহের কারণসমূহ :
- নীলকরদের অত্যাচার :
নীলকররা নীলচাষিদের নানাভাবে অত্যাচার করে নীলচাষ করতে বাধ্য করত। অনিচ্ছুক চাষিদের প্রহার করা, আটকে রাখা, স্ত্রী-কন্যার সম্মানহানি করা, চাষের সরঞ্জাম লুঠ করা, ঘরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া প্রভৃতি নানাভাবে চাষিদের অত্যাচার করত ।
অত্যাচারিত নীলচাষিরা আদালতে গিয়েও সুবিচার পেত না । আইন ছিল নীলকরদের স্বার্থরক্ষার জন্য, চাষিদের জন্য নয়। তা ছাড়া পুলিশ, প্রশাসন সবই ছিল নীলকরদের পক্ষে। উপরোক্ত কারণগুলির ফলস্বরূপ নীলচাষিরা বিচরণ বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাসের নেতৃত্বে নীলকরদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
নীল বিদ্রোহ ছিল নীলকরবিরোধী বিদ্রোহ— এটি অন্যান্য বিদ্রোহের মতো জমিদার বা মহাজনবিরোধী বিদ্রোহ ছিল না । বিদ্রোহীদের লক্ষ্য ছিল নীলচাষ প্রথার পুরোপুরি অবসান ঘটানো।
নীল বিদ্রোহের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল কৃষকদের কঠোর মনোভাব । এই বিদ্রোহে কৃষকরা দৃঢ়তার সঙ্গে মনস্থির করেছিল যে, মরব তবু নীলচাষ করব না। শেষপর্যন্ত বাংলার বিদ্রোহী কৃষকরা নীলচাষ বন্ধ করেছিল।
ওয়াহাবি, ফরাজি, সাঁওতাল, মুন্ডা প্রভৃতি বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিল ধর্ম। কিন্তু নীল বিদ্রোহে তা ছিল না। নীল বিদ্রোহ ছিল মূলত কৃষকদের অধিকার রক্ষার বিদ্রোহ। নীল বিদ্রোহী হিন্দু মুসলমান সব সম্প্রদায়ের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে সামিল হয়েছিল।
খ্রিস্টান মিশনারিরা নীলচাষিদের উপর নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। জেমস লঙ 'নীলদর্পণ' নাটকটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এজন্য তাঁকে জেলেও যেতে হয়েছিল।
এল নটরাজন বলেছেন, নীলচাষ করতে অস্বীকার করে বাংলার কৃষকরা ভারতের ইতিহাসে প্রথম ধর্মঘটের নজির সৃষ্টি করে। ভারতে কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাসে এই ঘটনা ছিল অভিনব।
নীল বিদ্রোহের তীব্রতায় বাংলার ছোটোলাট জে পি গ্রান্ট ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর নীল কমিশন (Indigo Commission) গঠন করেন। পাঁচ সদস্যের এই কমিশন তার রিপোর্টে জানায় যে, নীলকরদের বিরুদ্ধে নীলচাষিদের অভিযোগগুলি সত্য।
সংগঠিত ও সংঘবদ্ধ হলে যে বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো যায় বাংলার নিরীহ নীলচাষিদের বিদ্রোহ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
নীল বিদ্রোহ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহের বিদ্রোহীরা মানসিকভাবে ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ়। তাই এই বিদ্রোহ গণবিদ্রোহে পরিণত হয়েছিল।
অধ্যাপক চিত্তব্রত পালিত-এর মতে, উনিশ শতকে বাংলার নীল বিদ্রোহ ছিল আসলে জমিদারদের সঙ্গে ইংরেজ নীলকর সাহেবদের সংঘাত । তিনি মনে করেন, নীলকর সাহেবরা গ্রামে আধিপত্য স্থাপন করায় বাঙালি জমিদারদের স্বার্থে আঘাত লাগে। তাদের নির্দেশে চাষিরা নীলকরদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক অধ্যাপক পালিতের মত সমর্থন করেন না। বাংলার ছোটোলাট পিটার গ্রান্ট একে ‘লক্ষ লক্ষ লোকের তীব্র অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ' বলেছেন। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের ৬০ লক্ষ কৃষক নীল বিদ্রোহে শামিল হয়েছিল। এইভাবে সমাজের সর্বস্তরের মানুষই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যোগদান করে এই বিদ্রোহকে প্রকৃত গণবিদ্রোহে পরিণত করে।
অমৃতবাজার পত্রিকার সম্পাদক শিশির কুমার ঘোষ-এর মতে, নীল বিদ্রোহই সর্বপ্রথম দেশের মানুষকে সংঘবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা ও রাজনৈতিক আন্দোলনের গুরুত্ব অনুভব করতে শিখিয়েছিল। বস্তুতপক্ষে বাংলায় ব্রিটিশ রাজত্বকালে নীল বিদ্রোহ ছিল প্রথম বিপ্লব। তাই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলন হিসেবে নীল বিদ্রোহের রাজনৈতিক তাৎপর্য অস্বীকার করা যায় না ।
- দাদন প্রথা :
নীলকর সাহেবরা দরিদ্র চাষিদের নীলচাষ করার জন্য দাদন বা অগ্রিম অর্থ দিত। তারা প্রতি বিঘায় ২ টাকা অগ্রিম দিয়ে চাষিকে সবচেয়ে ভালো জমিতে নীলচাষ করতে বাধ্য করত। একবার কেউ দাদন নিলে সে আর নীলচাষ না করে বেরিয়ে আসতে পারত না। কোনো চাষি দাদন নিতে না চাইলে তার গোরুবাছুর নীলকুঠিতে আটকে রেখে তাকে দাদন নিতে বাধ্য করা হত।
- বিভিন্ন আইন পাস :
১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে লর্ড উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক পঞ্চম আইন এবং সপ্তম আইন পাস করে ঘোষণা করেন যে, কোনো চাষি দাদন নিয়ে নীলচাষ না করলে তাকে গ্রেফতার করা হবে ও তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে। পরে একাদশ আইন পাস হওয়ায় নীলচাষিদের উপর অত্যাচার বহু মাত্রায় বৃদ্ধি পায়। একাদশ আইন পাস করে বলা হয় যে, নীলকরদের থেকে দাদন নিয়ে কোনো চাষি নীলচাষ না করলে তাকে বিঘা প্রতি ১০ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
- অবিচার :
অত্যাচারিত নীলচাষিরা আদালতে গিয়েও সুবিচার পেত না । আইন ছিল নীলকরদের স্বার্থরক্ষার জন্য, চাষিদের জন্য নয়। তা ছাড়া পুলিশ, প্রশাসন সবই ছিল নীলকরদের পক্ষে। উপরোক্ত কারণগুলির ফলস্বরূপ নীলচাষিরা বিচরণ বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাসের নেতৃত্বে নীলকরদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।- প্রতারণা ও কারচুপি :
নীল কেনার সময় নীলকররা নীলচাষিদের নীলের ওজন কম দেখাত, জমির মাপে কারচুপি করত, কম দামে নীল বিক্রি করতে বাধ্য করত; তা ছাড়া জোর করে বিভিন্নভাবে অর্থ আদায়ও করত।
- পত্রপত্রিকার প্রভাব :
নীলচাষিদের উপর নীলকরদের অবর্ণনীয় অত্যাচারের কথা সে সময়কার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ও লেখায় প্রকাশিত হয়েছে। হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকায় নীলচাষিদের সমর্থনে নিয়মিত লেখা প্রকাশ করা হত। এছাড়া দীনবন্ধু মিত্রের 'নীলদর্পন' নাটকও এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে।
নীল বিদ্রোহের বৈশিষ্ট্য :
এই বিদ্রোহ ছিল মূলত একটি কৃষক বিদ্রোহ কিন্তু এই বিদ্রোহের একাধিক বৈশিষ্ট্য ছিল এই বিশিষ্ট সম্পর্কে আলোচিত হলো—- নীলকরবিরোধী বিদ্রোহ :
নীল বিদ্রোহ ছিল নীলকরবিরোধী বিদ্রোহ— এটি অন্যান্য বিদ্রোহের মতো জমিদার বা মহাজনবিরোধী বিদ্রোহ ছিল না । বিদ্রোহীদের লক্ষ্য ছিল নীলচাষ প্রথার পুরোপুরি অবসান ঘটানো।- কৃষকদের কঠোর মনোভাব :
নীল বিদ্রোহের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল কৃষকদের কঠোর মনোভাব । এই বিদ্রোহে কৃষকরা দৃঢ়তার সঙ্গে মনস্থির করেছিল যে, মরব তবু নীলচাষ করব না। শেষপর্যন্ত বাংলার বিদ্রোহী কৃষকরা নীলচাষ বন্ধ করেছিল। - ধর্মনিরপেক্ষ বিদ্রোহ :
ওয়াহাবি, ফরাজি, সাঁওতাল, মুন্ডা প্রভৃতি বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিল ধর্ম। কিন্তু নীল বিদ্রোহে তা ছিল না। নীল বিদ্রোহ ছিল মূলত কৃষকদের অধিকার রক্ষার বিদ্রোহ। নীল বিদ্রোহী হিন্দু মুসলমান সব সম্প্রদায়ের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে সামিল হয়েছিল।- বিদ্রহে খ্রিস্টান মিশনারিদের সমর্থন :
খ্রিস্টান মিশনারিরা নীলচাষিদের উপর নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। জেমস লঙ 'নীলদর্পণ' নাটকটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এজন্য তাঁকে জেলেও যেতে হয়েছিল।- আন্দোলনে প্রথম ধর্মঘটের প্রয়োগ :
এল নটরাজন বলেছেন, নীলচাষ করতে অস্বীকার করে বাংলার কৃষকরা ভারতের ইতিহাসে প্রথম ধর্মঘটের নজির সৃষ্টি করে। ভারতে কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাসে এই ঘটনা ছিল অভিনব।![]() |
| নীলচাষ |
নীল বিদ্রোহের গুরুত্ব :
- নীল কমিশন গঠন :
নীল বিদ্রোহের তীব্রতায় বাংলার ছোটোলাট জে পি গ্রান্ট ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর নীল কমিশন (Indigo Commission) গঠন করেন। পাঁচ সদস্যের এই কমিশন তার রিপোর্টে জানায় যে, নীলকরদের বিরুদ্ধে নীলচাষিদের অভিযোগগুলি সত্য।- সংগঠিত কৃষক বিদ্রোহ :
সংগঠিত ও সংঘবদ্ধ হলে যে বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো যায় বাংলার নিরীহ নীলচাষিদের বিদ্রোহ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। - স্বতঃস্ফূর্ত গণবিদ্রোহ :
নীল বিদ্রোহ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহের বিদ্রোহীরা মানসিকভাবে ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ়। তাই এই বিদ্রোহ গণবিদ্রোহে পরিণত হয়েছিল।- বাঙালি জাতির মনোবল বৃদ্ধি :
নীল বিদ্রোহ ছিল বাঙালির সফল সংঘবদ্ধ আন্দোলন। এই আন্দোলনে জয়লাভ করার ফলে বাঙালি জাতির মনোবল বৃদ্ধি পেয়েছিল।
নীল বিদ্রোহ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির সমর্থন লাভ করেছিল।
নীল বিদ্রোহের ব্যাপকতা লক্ষ করে সরকার বাধ্য হয়ে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে নীল কমিশন গঠন করে।*1 এই কমিশন নীলচাষকে নীলচাষিদের ইচ্ছাধীন বলে ঘোষণা করে। পুঁজি বিনিয়োগ পরিবর্তন : নীল বিদ্রোহে এবং সরকারি হস্তক্ষেপে আশঙ্কিত হয়ে নীলকররা নীলচাষ থেকে পুঁজি সরিয়ে নিয়ে তা অন্যত্র বিনিয়োগ করতে বাধ্য হয়।
শিশির কুমার ঘোষ লিখেছেন, নীল বিদ্রোহই সর্বপ্রথম দেশের মানুষকে রাজনৈতিক সংঘবদ্ধতার প্রেরণা জুগিয়েছিল। তাঁর মতে, নীল বিদ্রোহই ছিল সর্বপ্রথম ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ গণ আন্দোলন। এই বিদ্রোহের দ্বারা বাঙালি জাতির আত্মশক্তির প্রমাণ পাওয়া যায় ।
নীল বিদ্রোহকালে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র, শিশির কুমার ঘোষ-সহ বহু শিক্ষিত ব্যক্তিত্ব তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে জনমত গঠনে এগিয়ে এসেছিলেন। এর ফলে কৃষকদের সঙ্গে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির যোগসূত্র গড়ে ওঠে।
নীল বিদ্রোহের ফলে কৃষকরা নীলচাষ থেকে রেহাই পায়। নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে কৃষকদের এই সাফল্য বাংলার ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
নীল বিদ্রোহে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কৃষকই জোটবদ্ধভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। পাশাপাশি এই কৃষকদের সমর্থনে এগিয়ে এসেছিল ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি । ফলে এক সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক ঐক্যের সৃষ্টি হয়েছিল।
ইতিহাসবিদ ব্লেয়ার কিং, নিজের লেখা 'The Blue Mutiny' গ্রন্থে মহাজন শ্রেণির কর্তৃত্ব বৃদ্ধির বিষয়টি দেখিয়েছেন। তাঁর মতে, নীলকর সাহেবদের কর্তৃত্বের জায়গাটি বিদ্রোহের পরে মহাজনদের হাতে চলে গিয়েছিল।
নীল বিদ্রোহের প্রকৃতি সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
- শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির সমর্থনলাভ :
নীল বিদ্রোহ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির সমর্থন লাভ করেছিল।নীল বিদ্রোহের ফলাফল :
- নীল কমিশন গঠন :
নীল বিদ্রোহের ব্যাপকতা লক্ষ করে সরকার বাধ্য হয়ে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে নীল কমিশন গঠন করে।*1 এই কমিশন নীলচাষকে নীলচাষিদের ইচ্ছাধীন বলে ঘোষণা করে। পুঁজি বিনিয়োগ পরিবর্তন : নীল বিদ্রোহে এবং সরকারি হস্তক্ষেপে আশঙ্কিত হয়ে নীলকররা নীলচাষ থেকে পুঁজি সরিয়ে নিয়ে তা অন্যত্র বিনিয়োগ করতে বাধ্য হয়।- প্রেরণাদান :
শিশির কুমার ঘোষ লিখেছেন, নীল বিদ্রোহই সর্বপ্রথম দেশের মানুষকে রাজনৈতিক সংঘবদ্ধতার প্রেরণা জুগিয়েছিল। তাঁর মতে, নীল বিদ্রোহই ছিল সর্বপ্রথম ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ গণ আন্দোলন। এই বিদ্রোহের দ্বারা বাঙালি জাতির আত্মশক্তির প্রমাণ পাওয়া যায় ।- শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির যোগদান :
নীল বিদ্রোহকালে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র, শিশির কুমার ঘোষ-সহ বহু শিক্ষিত ব্যক্তিত্ব তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে জনমত গঠনে এগিয়ে এসেছিলেন। এর ফলে কৃষকদের সঙ্গে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির যোগসূত্র গড়ে ওঠে।- কৃষকদের সাফল্য :
নীল বিদ্রোহের ফলে কৃষকরা নীলচাষ থেকে রেহাই পায়। নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে কৃষকদের এই সাফল্য বাংলার ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।- সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক ঐক্যবদ্ধতা :
নীল বিদ্রোহে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কৃষকই জোটবদ্ধভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। পাশাপাশি এই কৃষকদের সমর্থনে এগিয়ে এসেছিল ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি । ফলে এক সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক ঐক্যের সৃষ্টি হয়েছিল। - মহাজন শ্রেণির ক্ষমতাপ্রাপ্তি :
ইতিহাসবিদ ব্লেয়ার কিং, নিজের লেখা 'The Blue Mutiny' গ্রন্থে মহাজন শ্রেণির কর্তৃত্ব বৃদ্ধির বিষয়টি দেখিয়েছেন। তাঁর মতে, নীলকর সাহেবদের কর্তৃত্বের জায়গাটি বিদ্রোহের পরে মহাজনদের হাতে চলে গিয়েছিল।
নীল বিদ্রোহের প্রকৃতি :
নীল বিদ্রোহের প্রকৃতি সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।- নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে জমিদারদের আন্দোলন :
অধ্যাপক চিত্তব্রত পালিত-এর মতে, উনিশ শতকে বাংলার নীল বিদ্রোহ ছিল আসলে জমিদারদের সঙ্গে ইংরেজ নীলকর সাহেবদের সংঘাত । তিনি মনে করেন, নীলকর সাহেবরা গ্রামে আধিপত্য স্থাপন করায় বাঙালি জমিদারদের স্বার্থে আঘাত লাগে। তাদের নির্দেশে চাষিরা নীলকরদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।- গণ আন্দোলন :
তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক অধ্যাপক পালিতের মত সমর্থন করেন না। বাংলার ছোটোলাট পিটার গ্রান্ট একে ‘লক্ষ লক্ষ লোকের তীব্র অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ' বলেছেন। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের ৬০ লক্ষ কৃষক নীল বিদ্রোহে শামিল হয়েছিল। এইভাবে সমাজের সর্বস্তরের মানুষই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যোগদান করে এই বিদ্রোহকে প্রকৃত গণবিদ্রোহে পরিণত করে।- সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলন :
অমৃতবাজার পত্রিকার সম্পাদক শিশির কুমার ঘোষ-এর মতে, নীল বিদ্রোহই সর্বপ্রথম দেশের মানুষকে সংঘবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা ও রাজনৈতিক আন্দোলনের গুরুত্ব অনুভব করতে শিখিয়েছিল। বস্তুতপক্ষে বাংলায় ব্রিটিশ রাজত্বকালে নীল বিদ্রোহ ছিল প্রথম বিপ্লব। তাই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলন হিসেবে নীল বিদ্রোহের রাজনৈতিক তাৎপর্য অস্বীকার করা যায় না ।উপসংহার :
পরিশেষে বলা যায় যে নীল বিদ্রোহ বাঙালি সমাজে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আবেদন সৃষ্টি করেছিল বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় নীল চাষীদের বিদ্রোহকে সমর্থন করেছিল। হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় তার হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকায় নীল চাষীদের সমর্থনে নিয়মিত লেখা প্রকাশ করতেন। তাছাড়া অন্যান্য পত্রপত্রিকা ও নাটক যেভাবে নীল বিদ্রোহ সমর্থন করেছিল তাও ছিল অভূতপূর্ব।


0 মন্তব্যসমূহ