১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে সরকার বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নিলে তার বিরুদ্ধে যে আন্দোলন সংঘটিত হয় তা বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন নামে পরিচিত। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের চালিকাশক্তি যেমন ছিল বাংলার মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজ তেমনি অন্যদিকে এই আন্দোলনের প্রাণশক্তি ছিল বাংলার ছাত্র সমাজ। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে ছাত্র সমাজের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান এই আন্দোলনকে আরো তীব্র আকার দিয়েছিল। এই সময় আন্দোলনে সঙ্গে যুক্ত ছাত্রদের সাহায্য করা ও ঐক্যবদ্ধ করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটি।
অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটি প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট :
বিশ শতকে প্রথমার্ধে ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাবের প্রধান প্রাণকেন্দ্র ছিল বাংলা। তাই বাংলায় তথা ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব কে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে লর্ড কার্জন ভারতবাসীদের প্রশাসনিক অজুহাত দেখিয়ে বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করার চেষ্টা করেন। তাই তিনি ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ২০ জুলাই বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন।
এতে বলা হয় ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ১৬ই অক্টোবর সরকারিভাবে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করা হবে। এর প্রতিবাদে সমগ্র বাংলায় জুড়ে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠে আর এই আন্দোলনে ছাত্রসমাজ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে যার কারণে বঙ্গভঙ্গ করা ব্রিটিশদের কাছে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকে ছাত্র সমাজকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাংলার তৎকালীন মুখ্য সচিব টমাস কার্লাইল ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ২২ শে অক্টোবর কার্লাইল সার্কুলার জারি করেন।
কার্লাইল সার্কুলারের মূল উদ্দেশ্য ছিল ছাত্র আন্দোলনের বীজের অঙ্কুরদগম কে নষ্ট করে দেওয়া।
কার্লাইল সার্কুলারের ঘোষণা:
- বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছাত্রদের সরকারি স্কুল কলেজ থেকে বিতাড়িত করা হবে।
- ছাত্রদের বন্দেমাতরম ধ্বনি দেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়।
- ছাত্রদের সভা সমিতিতে যোগদান নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়।
- সরকারি স্কুল কলেজের সঙ্গে যুক্ত ছাত্ররা স্বদেশী পণ্য বিক্রি করতে পারবে না।
অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটি প্রতিষ্ঠা :
কার্লাইল সার্কুলার এর প্রতিবাদে কলকাতার সিটি কলেজের বিএ ক্লাসের ছাত্রনেতা শচীন্দ্র প্রসাদ বসু ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ৪ ঠা নভেম্বর অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। বিশিষ্ট ব্রাহ্মণ নেতা ও সিটি কলেজের অধ্যাপক কৃষ্ণ কুমার মিত্র এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হন এবং স্বয়ং শচীন্দ্র প্রসাদ বসু এই প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক পদে নিয়োজিত হন।
অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য :
- বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের যোগদানের অপরাধে যে সমস্ত ছাত্রদের সরকারি স্কুল থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে তাদের বিকল্প শিক্ষার ব্যবস্থা করা।
- বক্তৃতা সংগীত ও সভা যাত্রার মাধ্যমে দেশবাসীদের মধ্যে স্বদেশী আন্দোলনের আদর্শ প্রচার করা।
- বিদেশি প্যানাগারের সামনে পিকেটিং করা।
- স্কুল-কলেজের ছাত্র সমাজকে স্বদেশী মন্ত্রে দীক্ষিত করে তোলা।
- ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ করে স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে রাখা।
- স্বদেশী আন্দোলনে যোগদানের জন্য ছাত্রদের উৎসাহিত করা।
অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটির কার্যাবলী :
- এন্টি সার্কুলার সোসাইটি প্রতিষ্ঠার ফলে ব্রিটিশ বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে এক নতুন গতির সঞ্চার হয়।
- বিকল্প শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে একাধিক স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।
- এই স্কুল ও কলেজগুলিকে পরিচালিত করার উদ্দেশ্যে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠিত হয়।
0 মন্তব্যসমূহ