বাংলা তথা ভারতবর্ষে উনিশ শতক ছিল এক সংস্কারের যুগ। এ সময়ে বাংলায় সামাজিক প্রগতির পথে যে বাধাগুলি ছিল, তা দূর করার জন্য যেসব মনীষী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন, পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম।


ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর




    সমাজসংস্কার ও শিক্ষাপ্রসারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান :


    সমাজসংস্কার অবদান

    1.কৌলীন্য প্রথার বিরোধিতা :


    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তৎকালীন সমাজে প্রচলিত কৌলীন্য প্রথার বিরুদ্ধে হুগলি জেলার ১৩৩ জন ব্রাক্ষ্মণের বৈবাহিক সম্পর্কের তালিকা তৈরি করে সর্বসমক্ষে তা প্রকাশ করেন।

    2.বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে উদ্যোগ গ্রহণ :


    বহুবিবাহ প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে বিদ্যাসাগর বর্ধমানের রাজা তেজচন্দ্রের ঐকান্তিক সহযোগিতায় ৫০ হাজার ব্যক্তির স্বাক্ষর-সংবলিত একটি প্রতিবাদপত্র ইংরেজ সরকারের কাছে পেশ করেন।
    এ ছাড়া বিদ্যাসাগরের বাল্যবিবাহবিরোধী প্রতিবাদের পরিণামস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়ে মেয়েদের বিবাহের বয়স (সর্বনিম্ন ১০ বছর) আইনানুগভাবে ধার্য করে।

    3.বিধবাবিবাহ প্রবর্তনের উদ্যোগ :


    বিদ্যাসাগর তৎকালীন নারীদের অকাল বৈধব্যের দুর্দশা দেখে বিচলিত হন এবং বিধবাবিবাহের পক্ষে পরাশর সংহিতা থেকে শ্লোক উদ্ধৃত করেন। ওই বছরেই ভারতীয় আইনসভার সদস্যদের কাছে ১০০০ জন ব্যক্তির স্বাক্ষর-সংবলিত এক আবেদনপত্র পাঠানো হয়।

    এতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার দত্ত, রাজনারায়ণ বসু প্রমুখ। রাধাকান্ত দেব-এর তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুলাই বিধবাবিবাহ আইন পাস হয়।


    শিক্ষার প্রসারে অবদান :


    1.নারীশিক্ষার প্রসার :


    ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দের ৭ মে ড্রিংকওয়াটার বেথুনের প্রচেষ্টায় বিদ্যাসাগর উত্তর কলকাতায় ক্যালকাটা ফিমেল স্কুল (বর্তমানে বেথুন স্কুল) স্থাপনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন জেলায় ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন।

    2.স্কুল প্রতিষ্ঠা :


    বিদ্যাসাগর মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন, যা ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যাসাগর কলেজ-এ পরিণত হয়।

    এ ছাড়া তিনি শিক্ষক প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে নর্মাল স্কুল (১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দ) প্রতিষ্ঠা করেন ।

    3.বাংলা সাহিত্যে অবদান :

    বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষাকে সরল, সাবলীল ও বোধগম্য করে তোলেন। তিনি যতিচিহ্নের এবং ছোটো বাক্যগঠনের কৌশল ব্যবহার করেন। শিশুপাঠ্য হিসেবে রচনা করেন বর্ণপরিচয় ও বোধোদয়।
    এ ছাড়া ব্যাকরণ গ্রন্থ উপক্রমণিকা-সহ বেতাল পঞবিংশতি, শকুন্তলা, সীতার বনবাস ইত্যাদি বাংলায় অনুবাদ করেন।

    4.সংবাদপত্রে অবদান :


    ঈশ্বরচন্দ্রের অনুপ্রেরণায় দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ সোমপ্রকাশ পত্রিকাটি প্রকাশ করেন। পাশাপাশি তিনি সর্বশুভকরী, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা দুটির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

    উপসংহার :

    পরিশেষে বলা যায়, সমাজসংস্কার ও শিক্ষাপ্রসারের ক্ষেত্রে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান অনস্বীকার্য।