কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়

লকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হল ভারতের আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে প্রাচীনতম। ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিং-এর আমলে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই বোর্ড অফ কন্ট্রোলের সভাপতি চার্লস উড তাঁর নির্দেশনামায় কলকাতায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। সেই অনুযায়ী ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ধাঁচে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা হয়। লর্ড ক্যানিং ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আইন স্বাক্ষর করেন। ফলে এই দিনটিকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা দিবস বলা হয় ৷

কাদম্বিনী গাঙ্গুলী ও চন্দ্রমুখী বসু
কাদম্বিনী গাঙ্গুলী ও চন্দ্রমুখী বসু



উচ্চশিক্ষার বিকাশে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা :


প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যসমূহ :

লকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পিছনে উদ্দেশ্যগুলি হল—

  • শিক্ষার প্রসার ঘটানো :
ভারতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক্তিয়ারভুক্ত এলাকায় প্রজাদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটানোর কথা বলা হয়।

  • শিক্ষার বিভিন্ন শাখায় দক্ষতা নিরূপণ করা :
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হল সাহিত্য, বিজ্ঞান ও শিল্পকলার বিভিন্ন শাখায় পরীক্ষার মাধ্যমে সকল ছাত্রের দক্ষতা নিরূপণ করা ।

  • কলেজ অনুমোদন, পরীক্ষাগ্রহণ, উপাধিদান :
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য ছিল কলেজগুলিকে অনুমোদন দেওয়া, পরীক্ষা গ্রহণ করা ও উপাধি প্রদান করা।

  • পরিচালনা :
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য আচার্য ও উপাচার্য পদ এবং সিনেটের ব্যবস্থা করা হয়। সিনেট বা পরিচালন সভা ৩৮ জন সদস্য নিয়ে গড়ে উঠেছিল।

  1. চ্যান্সেলার বা আচার্য : কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম আচার্য ছিলেন ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিং ।
  2. ভাইস চ্যান্সেলার বা উপাচার্য : বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার অন্যতম প্রধান পদ হল ভাইস চ্যান্সেলার বা উপাচার্য। ভাইস চ্যান্সেলারের পদটি ছিল অবৈতনিক। তিনি সিনেট ও সিন্ডিকেটের সুপারিশ অনুসারে মনোনীত হতেন। তাদের পরামর্শ নিয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ পরিচালনা করতেন।
  • কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ছিলেন স্যার জেমস উইলিয়ম কোলভিল (২৪ জানুয়ারি, ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ২৪ জানুয়ারি, ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দ)
  • কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভারতীয় উপাচার্য ছিলেন স্যার গুরুদাস ব্যানার্জী (১ জানুয়ারি, ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৩১ ডিসেম্বর, ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দ)


কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্তিয়ারভুক্ত এলাকা :

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্তিয়ারভুক্ত এলাকা লাহোর থেকে রেঙ্গুন পর্যন্ত প্রসারিত ছিল। ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ বছর পূর্তির সময় বেশ কিছু এলাকাকে এর এক্তিয়ারভুক্ত করা হয়, যেমন— লাহোর, পাতিয়ালা, সিমলা, দিল্লি, অমৃতসর, ইন্দোর, আগ্রা, আজমির, জয়পুর, কটক, ঢাকা, গুয়াহাটি, রেঙ্গুন প্রভৃতি। এর বাইরে সিংহল ও বার্মাতেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্তিয়ার ছিল

  • এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম প্রবেশিকা পরীক্ষা আয়োজিত হয় ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে কলকাতার টাউন হলে।
  • প্রথম প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ছাত্রের সংখ্যা ছিল ২৪৪ জন।
  • ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে যদুনাথ বোস এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম স্নাতক হন।
  • ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় ।
  • ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের ১২ মার্চ সমাবর্তন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সিনেট হলের উদবোধন করা হয়।
  • ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা স্নাতক হন কাদম্বিনী গাঙ্গুলী ও চন্দ্রমুখী বসু।
  • কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বেণিমাধব বড়ুয়া এশিয়ার প্রথম ডিলিট হন।

হান্টার কমিশন :

লর্ড রিপন ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে হান্টার কমিশন নিয়োগ করেন। উইলিয়ম হান্টারের নেতৃত্বে গঠিত ইন্ডিয়ান এডুকেশন কমিশন ‘হান্টার কমিশন' নামে পরিচিত হয়। হান্টার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯০১-০২ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলেজ শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটে।

উপসংহার :

ভারতের শিক্ষার ইতিহাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অনস্বীকার্য। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন- নোবেল বিজয়ী সি ভি রমন, প্রখ্যাত বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা প্রমুখ । তাই বলা যায়, উনিশ শতকের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাবিস্তারের ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় নাম।